সারাদিনের হৈচৈ , চিল্লাফাল্লা সব কিছুর যখন সমাপ্তি টানতে হয় , বিছানায় গা এলিয়ে দেই , শরীরে আর জোর থাকে না। বসে বসে ভাবি আজ সারাদিন কি রাজকার্যটাই না করলাম । বিছানার পাশেই জানালা দিয়ে চোখ পরে বাহিরে । ক্ষনিকের জন্য হলেও চোখ আটকে যায় অসীম আকাশের পানে । ওই দুরের শুন্যতা কি বিশালতাটাকেই না ধারণ করে আছে। তার তুলনায় আমরা কতটাই না ক্ষুদ্র । নিজের ই হাসি পায় , নিজেকে নিয়ে । আমার ক্ষুদ্রতার মাঝেই কি চাঞ্চল্য , কত রহস্য । আর দুরের ওই অসীম আকাশের পানে কি না জানি রয়েছে ?
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আকাশের ওই বিশালতায় মুগ্ধ হতে হয় আমাদের । যেই মুগ্ধতা ছিল আমাদের সেই আদিম পূর্বপুরুষের মাঝেও । শিকার আর খাদ্যের যোগানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে একাকী কাজ হীন সময়ে তাকিয়ে থাকত সুদূর আকাশে , দৃষ্টি হারিয়ে যেত অসীমের মাঝে । প্রশ্ন জাগত মনে , মানব ইতিহাসের সবচাইতে মৌলিকতম প্রশ্ন। আমরা কে ? আমরা কোথা থেকে এলাম ? এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড কিভাবে সৃষ্টি হল ? এর কি একজন স্রস্টার প্রয়োজন ছিল ?
এই প্রশ্নগুলো সম্পর্কে আজ আমরা অনেকটাই জানি । অন্তত যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এই মহাবিশ্ব।
এই বিশালতার সৃষ্টি নিয়ে আদিম মানুষেরও ছিল অনেক জল্পনা কল্পনা , তারা এই সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব কল্পনা করেছে। অনুভব করেছে এক মহান অতিপ্রাকৃত শক্তির । যেই শক্তি কখনও তার একাকীত্ব কাটাতে গিয়ে, কখনও বা তার কথা বলার জন্য সৃষ্টি করেছিল এই জগত, এরপর এর প্রধান , মানুষকে । হাজার হাজার বছর পূর্বের সেই আদিম গুহাবাসী , বসঙ্গ গোষ্ঠী , নরসদের, আর তাদের এই জগত সৃষ্টি করার উপাদান গুলো ও বেশ হাস্যকর , অন্তত বিংশ শতাব্দীর যুগে । ধর্ম নিয়ে আমরা কোনও আলোচনা করব না , এখানে শুধু মহাবিশ্ব এবং এর সৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞান কি বলে তাই আলোচনার বিষয় ।
মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারনা সম্পূর্ণ ভিন্ন , এবং বাস্তবভিত্তিক যুক্তির উপরে গঠিত । খুব সম্ভবত , বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদ্ভব ঘটান গেলিলিও । তার ও বহু পূর্বে থেলিজ নামক এক আয়ওনিয়ান , যুক্তি ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়ার আবির্ভাব ঘটান , যা ছিল দর্শন । এবং আজকের বিজ্ঞানের পূর্বপুরুষ ।
গ্যলিলিও আমাদের দেখিয়েছেন কিভাবে পর্যবেক্ষণ এর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যায় ।
আমরা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মহাবিশ্ব সম্পর্কে যেই যৌক্তিক মডেল দাঁড় করিয়েছি , তা সেই আদিম পূর্বপুরুষের কল্পনা প্রসূত ধারনা থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য । বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিংবা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে । আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কিত তত্ত্বটিও এরকম কিছু প্রেডিকশন করে , যাকে বাস্তব সমর্থন করে । আদিম সেই মডেল গুলোতে অবশ্যই সেই গুন গুলো ছিল না । তাই আমরা বৈজ্ঞানিক মডেল এ আস্থা রাখতে পারি , যদিও তা ভবিষ্যতে সঠিক বলে পরযবাসিত নাও হতে পারে , তাকে পরিবর্তন করা হতে পারে, তবুও এগুলো গ্রহণ করা যায় অন্তত সেই আদিম মডেল গুলো থেকে ।
বৃহৎ বিস্ফোরণ এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টির নাটকীয় রহস্য গল্পের .....................
ট্রেন স্টেশন এ দাঁড়িয়ে থাকলে ট্রেন এর তীক্ষ্ণত্বর শব্দ শোনা যায় । ট্রেন যখন ছেড়ে দেয় তখন সে তার নিজস্ব শব্দ ও বাঁশি বাজাতে থাকে । প্লাটফরম এর কাছে , যে দাঁড়িয়ে থাকবে, ট্রেনটা স্টার্ট হবার পরে সে বুঝতে পারবে যে শব্দটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে । এবং একসময় মিলিয়ে যাচ্ছে । আচ্ছা ট্রেন এর শব্দ টা কেন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে ?
এরকম অযাচিত প্রশ্ন নিয়ে হয়ত কেউ ই মাথা ঘামাবেন না । শব্দ আস্তে আস্তে কমে যাবে আর ট্রেন কাছে এলে আস্তে আস্তে বাড়বে তাই তো স্বাভাবিক । অথচ এরকম অযাচিত প্রশ্ন করা এবং তার উত্তর দেবার জন্যই বিজ্ঞানের জন্ম এবং বিজ্ঞানীদের এত পরিশ্রম ।
যাই হোক, কাছে এলে শব্দের মাত্রা বেরে যাওয়া আর দূরে গেলে কমে যাওয়া, এই ঘটনাগুলোর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন ডপলার ।
আমরা জানি শব্দ হচ্ছে এক ধরনের শক্তি , যা তরঙ্গ আকারে প্রবাহিত হয় । ডপলার বললেন যখন কোনও শব্দের উৎস আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তখন সেই শব্দের মাত্রা বা কম্পাঙ্ক ক্রমাগত কমতে থাকে । আর যখন কাছে আসে তখন শব্দের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে । এই জিনিসটিকে আমরা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এর সাথে তুলনা করতে পারি । অর্থাৎ যখন শব্দের উৎস আমাদের কাছে আসতে থাকে তখন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমতে থাকে আর যখন দূরে যায় তখন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে । কারন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আর কম্পাঙ্ক একটি আরেকটির ব্যস্তানুপাতিক ।
আমরা ডপলার এফেক্টটি নিচে সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি -
সূত্রঃ
f'/f=( V + Vo)/(V - Vs)
এখানে
V= শব্দের বেগ ( সবাই জানি ! )
Vo= শ্রোতার বেগ (যে শব্দ শুনবে তার বেগ )
Vs= উৎসের বেগ (যে শব্দ করবে তার বেগ )
f= উৎপন্ন শব্দের কম্পাঙ্ক (দেয়া থাকবে )
f'=বেগের কারনে পরিবর্তিত কম্পাঙ্ক (এটাই বের করতে হবে )
এবার যে দুটো জিনিস মনে রাখতে হবে তা হলো
১ - কাছে আসলে যোগ !
২-দূরে গেলে বিয়োগ !
অর্থাৎ দূরে গেলে সূত্র টি হবে -
f'/f=(V+Vo)/{V-(-Vs)}
আমরা জানি , তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ƛ = V/f ।
অর্থাৎ আমরা যদি বেগ কে স্থির রেখে , কম্পাঙ্ক বাড়াই তবে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমবে , আর কম্পাঙ্ক কমালে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়বে । যেই কথাটা আমরা উপরে বলেছিলাম তা এখন গাণিতিক ভাবে দেখালাম ।
আচ্ছা বলুন তো আমাদের দৃশ্যমান আলো আসলে কি ? মূলত, আলো ও একধরনের তরঙ্গ । অতএব
আমরা বলতে পারি যেই জিনিসটা শব্দ তরঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা অবশ্যই আলোক তরঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য (For light the equation is different, there is a root over the RHS) । আরেকটু ভেঙ্গে বললে জিনিসটা আসলে এরকম , যদি আলোর উৎস আমাদের থেকে দূরে যেতে থাকে তবে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাবে । আর অন্যদিকে আলোর উৎস যদি আমাদের কাছে আসতে থাকে তবে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমতে থাকবে । লাল রঙের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচাইতে বেশি এবং বেগুনি আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচাইতে কম ।
১৯২৯ সালের কথা । এডউইন হাবল নামের এক মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আকাশ পর্যবেক্ষণ করে
দেখতে পেলেন – আকাশের সমস্ত নীহারিকা থেকে আলোর রক্তিম বর্ণালি আমরা লক্ষ করি । আমার উপরের কথা গুলো যদি বুঝে থাকেন তবে আমরা বলতে পারি সমস্ত গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । মানে হল , লাল আলো। অর্থাৎ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি , এবং গ্যালাক্সি গুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । হাবল আরও দেখলেন , যেই গ্যালাক্সি আমাদের থেকে যত দূরে সে আসলে তত দ্রুত আমাদের থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে । শেষ পর্যন্ত হাবল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে , আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে ।
আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে এই কথাটির অর্থ কী ? এই প্রসারণ কিরূপ ? বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করলেন এই প্রসারণটা অনেকটা বেলুন ফুলানোর মত । ব্যাপারটা এরকম , আমরা জন্মদিনের সময় এক ধরনের বেলুন কিনি , যার উপরে HAPPY BIRTHDAY কথাটা লিখা থাকে । এছাড়াও আরও অনেক বিন্দু ও আপনি লক্ষ করবেন লিখাটার চারিপাশে । চুপসানো অবস্থায় লিখাটা এবং বিন্দু গুলোর মাঝে দূরত্ব কম থাকে এবং তারা আকারেও ছোট থাকে । বেলুনটিকে আমরা যতই ফুলাই তার মাঝের বিন্দু গুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে । এখন এই বিন্দু গুলোকে আমরা নীহারিকা হিসেবে কল্পনা করি । যেখানে কসমিক ফেব্রিক্স এর উপরে নীহারিকাগুচ্ছ ( অনেকটা বেলুনের উপরের বিন্দু গুলোর মত ) পরস্পরের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়ে চলছে । এই হল মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে , এই কথাটির একটি সরল চিত্রায়ন ।
হাবলের ঘোষণার আগে মহান আইনস্টাইন ও এই ঘোষণার একটা সুযোগ পেয়েছিলেন। তার আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণের এরকম একটা ভবিষ্যদ্বাণী বেরিয়ে আসল । কিন্তু আইনস্টাইন স্থির মহাবিশ্বে বিশ্বাসী ছিলেন । তাই তিনি তার তত্ত্বে একটি মহাজাগতিক ধ্রুবক বসিয়ে দিলেন । অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে না !
হাবলের ঘোষণার পরে আইনস্টাইন বললেন যে মহাজাগতিক ধ্রুবকটি ছিল তার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল । যদিও আমরা এই আলোচনার শেষাশেষি দেখব আইনস্টাইনের এই ভুলের ও একটা গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে ।
যাই হোক এতক্ষণ আমরা বুঝলাম , হাবল যেই মহাবিশ্বের প্রসারণের কথা বলেছিলেন, তা আসলে কি এবং এই প্রসারণটা কিভাবে সম্পন্ন হয় । আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে,নীহারিকা গুলো পরস্পর থেকে দূরে ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ অতীতে কোনও এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে তারা পরস্পর পরস্পরের অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছিল ।
জর্জ লেমাত্রে ,যাকে ‘Hot big bang model’ এর জনক বলা হয় । তার মডেলের রূপরেখাটা এরকম , সেই সৃষ্টির শুরুতে , আদিতে আমাদের এই মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তুপিণ্ডই একে অপরের অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছিল । কতটা কাছে ? আসলে তারা একে অপরের এতটাই কাছাকাছি অবস্থান করছিল যে আমাদের সমস্ত মহাবিশ্বটাই ছিল এক অসীম ঘনত্বের এক উত্তপ্ত বিন্দু । স্রেফ একটা বিন্দু । যা পরমাণু , এমনকি ক্ষুদ্র কণিকাদের চাইতেও কোঠি কোঠি গুন ছোট । ভাবা যায় , কিভাবে এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড একটা বিন্দুর মাঝে অবস্থান করেছিল !
যেই বিন্দু তাবৎ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করতে পারে তা নিশ্চয়ই কোন সাদামাটা বিন্দু নয় । এই বিন্দুটিও তেমন ছিল না । এটি ছিল একটা singularity point যেখানে এলে পদার্থবিদ্যার জানিত সমস্ত বিধিই ভেঙ্গে পরে । এই পর্যায়ে আসার পরে আমরা আর কিছুই বলতে পারি না । এই আমাদের জ্ঞান এর সীমানা । এর আগে কি হয়েছিল তাও আমরা জানি না । বিজ্ঞানী জর্জ লেমাত্রে এর একটা সুন্দর নাম দিয়েছিলেন । Pimeval Atom বা আদিম পরমাণু ।
এবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি । আমরা জানি , পরমাণুর মত ক্ষুদ্র পর্যায়ে, সেই জগটাতে , চিরায়ত বলবিদ্যার কিছুই করবার থাকে না । ওই বিশৃঙ্খল , অস্থির জগতটাকে ব্যাখ্যা করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স । আর মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে আপেক্ষপবাদ । আমাদের সেই আদিম পরমাণু এমনি এক বিন্দ যার ক্ষুদ্রতা আহবান করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নীতিকে আর অসীম ভর স্পষ্ট করে তোলে ব্যাপক আপেক্ষবাদকে । অতএব আমাদের প্রয়োজন হয় এক মৌলিক সমন্বয়ের । যা যুক্ত করবে আপেক্ষবাদ এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স কে , আর আমরা ব্যাখ্যা করতে পারব সেই আদিম পরমাণুটিকে , আমাদের সত্ত্বার আদি কারন ।
উত্তপ্ত বৃহৎ বিস্ফোরণের মডেলের পর আরও অনেক সংশোধনী এসেছে , এসেছে cosmological model , যা আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টিকে আরও সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করে । সেই সংশোধনী তত্ত্ব গুলো কিরূপ এবং সত্যই কিভাবে আমাদের এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে , আমরা কতটুকু এগিয়েছি মৌলিক সমন্বয়ের দিকে তা নিয়ে আলোচনা করব অন্য কোনও এক সংখ্যায় ।